৪৩ বছর ধরে প্রতারণা করে ‘ধনকুবের’, এই প্রথম আটক

দাউদকান্দি উপজেলা

কুমিল্লার দাউদকান্দি এলাকার বাসিন্দা বারেক সরকার ওরফে বারেক হাজী (৬৩)। লেখাপড়ায় প্রাথমিকের গণ্ডি পেরুতে না পারায় ১৮ বছর বয়সে তাকে সৌদি আরব পাঠিয়ে দেন বাবা-মা। তবে সেখানে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও মানুষ ঠকানোর নানা কৌশল রপ্ত করে। দুই বছর পর দেশে ফিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেয় প্রতারণার জাল। দীর্ঘ ৪৩ বছর ধরে প্রতারণার মাধ্যমে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় এই প্রতারক। প্রচণ্ড কৌশলী হওয়ায় এত দীর্ঘ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেফতার এড়িয়ে গেছে বারেক।
রবিবার (২৬ মে) দুপুরে রাজধানীর কাওরানবাজারের র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান র‌্যাব-৪-এর অধিনায়ক (সিও) অতিরিক্ত ডিআইজি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির।

আগের দিন শনিবার (২৫ মে) দিনগত রাতে রাজধানীর দারুসসালাম এলাকা থেকে প্রতারক চক্রের হোতা বারেকসহ ৫ জনকে আটক করেন র‌্যাব-৪-এর সদস্যরা। এ সময় বারেকের কাছ থেকে ১টি বিদেশি পিস্তল, ১টি ম্যাগাজিন ও ২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। আটক অন্য ব্যক্তিরা হলো হাবিবুর রহমান (২৪), জাকির হোসেন (৫৮), আক্তারুজ্জামান (২৮) ও শাহরিয়ার তাসিম (১৯)।

র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক (সিও) অতিরিক্ত ডিআইজি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির বলেন, গত ২ মার্চ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এই চক্রের ২২ সদস্যকে আটক করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চক্রের হোতা বারেকসহ ৫ জনকে আটক করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘৪৩ বছরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রতারণার মাধ্যম অন্তত শত কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করেছে বারেক। ঢাকা শহরে নিজের নামে ফ্ল্যাট, গাড়ি এবং গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় জমি-জমাসহ অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছে সে। সব কিছুই করেছে সে প্রতারণার মাধ্যমে।’
র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘রয়্যাল চিটার ডেভেলপমেন্ট (আরসিডি) নামে একটি প্রতারণা কোম্পানি খোলে বারেক। এই নামে অফিস নেওয়াসহ সব কার্যক্রম সম্পন্ন হলেও কোম্পানির প্রকৃত নাম সবার অজানা ছিল। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরসিডির ছোট ছোট গ্রুপ রয়েছে। যারা সুসজ্জিত অফিস ভাড়া করে বিত্তবানদের ফাঁদে ফেলে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়।’
র‌্যাব-৪-এর অধিনায়ক বলেন, ‘এই চক্রটি অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অবসরের আগে থেকেই টার্গেট করে। এরপর তাদের কোম্পানিতে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে অফিসে নিয়ে আসে এবং প্রতিষ্ঠানের শেয়ার হোল্ডার হওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে। অফিস কর্মকর্তাদের চালচলনে অভিভূত হয়ে টার্গেট করা ব্যক্তিরা অবসরকালীন প্রাপ্ত পেনশনের টাকা বিনিয়োগ করতেন। এর কয়েকদিন পরেই অফিসসহ উধাও হয়ে যেতো অফিসের কর্মকর্তারা।’
তিনি বলেন, ‘এছাড়া, দেশের বিভিন্ন এলাকার তাঁত ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের কয়েক কোটি টাকার অর্ডারের ফাঁদে ফেলে ৪০-৫০ হাজার টাকার স্যাম্পল নিতো। কয়েক কোটি টাকার মালামাল তৈরিতে যে পরিমাণ কাঁচামাল প্রয়োজন (সুতা, রং ইত্যাদি) তা সরবরাহের কথা বলে অগ্রিম হিসেবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রতারণা করে আসছিল চক্রটি।’
অতিরিক্ত ডিআইজি চৌধুরী মঞ্জুরুল বলেন, ‘অপরদিকে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ব্যক্তিদের জমি বা নির্মাণাধীন ভবনের ওপর ইন্টারনেট টাওয়ার স্থাপনের প্রলোভন দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতেন। কখনও বিভিন্ন এলাকায় আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ব্যক্তিদের বাসায় এবং তার এলাকার মাদ্রাসা, মসজিদে এনজিও’র পক্ষ থেকে বিনা খরচে সৌর প্যানেল বসানোর কথা বলে মোটা টাকা হাতিয়ে নিতো। এছাড়া ইটপাথর, রড-সিমেন্ট, গার্মেন্টস, চাল, থাই অ্যালুমিনিয়াম, সোলার প্যানেল ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার লোকদের টার্গেট করে তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থের অর্ডারের ফাঁদে ফেলতো। অর্ডারের ভুয়া চুক্তিপত্র করে অগ্রিম টাকা নিয়ে প্রতারণা করে আসছিল চক্রটি।’
আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা  প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।সূত্র বাংলা ট্রিবিউন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.